ইসি গঠনে জমা পড়ল সাড়ে তিন শ’ নাম

Sas-1.jpg

রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিপর্যায়ে প্রায় ২০০ প্রস্তাবিত নাম 

মিরাজ মৃত্তিক :

নতুন ইসি গঠনে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে প্রথমে ৬ ফেব্রুয়ারি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নাম প্রস্তাব করার অনুরোধ করেছিল অনুসন্ধান কমিটি। এরপর ইসিতে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর ঠিকানায় গত বুধবার চিঠি দিয়ে নাম দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে প্রতিটি দলকে গতকাল শুক্রবার বিকেল পাঁচটার মধ্যে অনধিক ১০ জনের নাম (প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার হওয়ার মতো যোগ্য ব্যক্তি) পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছিল।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে যোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ মোট ২৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অনুসন্ধান কমিটির কাছে নাম প্রস্তাব করেছে। এ ছাড়া ৬টি পেশাজীবী সংগঠন এবং ব্যক্তিপর্যায় থেকে নামের বিষয়ে প্রায় ২০০ প্রস্তাব এসেছে। অনুসন্ধান কমিটি সূত্রে জানা গেছে, সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন শ নাম জমা পড়েছে। এসব নামের তালিকায় প্রশাসনিক কাজে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক আমলাই প্রাধান্য পেয়েছেন। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল আছে ৩৯টি। বিএনপিসহ ১৫টি রাজনৈতিক দল ইসি গঠনে কোনো নাম জমা দেয়নি।

অনুসন্ধান কমিটির সাচিবিক দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যুগ্ম সচিব শফিউল আজিম গতকাল বিকেল পাঁচটার পর সাংবাদিকদের বলেন, ২৪টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এসেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ, কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনসহ ৬টি পেশাজীবী সংগঠন প্রস্তাব দিয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে দেশ ও বিদেশ থেকে অনেক বড় সংখ্যায় প্রস্তাব পাওয়া গেছে। এগুলো এসেছে মূলত ই-মেইলে। তবে মোট কতজনের নাম এসেছে, সেটি তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি তিনি। নামগুলোর তালিকা করে এখন অনুসন্ধান কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হবে।

অনুসন্ধান কমিটির সূত্রমতে, রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ ১০টি করে নাম দিতে বলা হলেও কোনো কোনো সংগঠন কম নাম দিয়েছে। কেউ কেউ পাঁচটি নামও দিয়েছে। আবার ব্যক্তিপর্যায়ে প্রায় ২০০ জন যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেখানে অনেকেই শুধু নিজের নাম দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ ইসি গঠনে একাধিক নামও প্রস্তাব করেছেন। তবে অনেকেই জীবনবৃত্তান্ত ছাড়াই শুধু নাম দিয়েছেন। ফলে সেই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। সব মিলিয়ে ইসি গঠনে প্রায় সাড়ে তিন শ নাম জমা পড়েছে। যদিও একই নাম একাধিক প্রস্তাবে রয়েছে।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে গতকাল নাম জমা দিয়ে আসেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ ও উপদপ্তর সম্পাদক সায়েম খান।  সেলিম মাহমুদ মিডিয়াকে বলেন, সিলগালা খামে করে নামগুলো তাঁরা জমা দিয়েছেন। দলের সভাপতি শেখ হাসিনা এবং সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যদের সিদ্ধান্তে নামের তালিকা করা হয়েছে। সেখানে কাদের নাম আছে, তা তিনি জানেন না।

আগের দিন বৃহস্পতিবার জাতীয় পার্টি (জাপা), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলসহ (জাসদ) অন্তত পাঁচটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অনুসন্ধান কমিটির কাছে নাম প্রস্তাব করেছিল।

এবারের প্রস্তাবিত নামের তালিকায় আমলাদের প্রাধান্যের বিষয়টি জাসদের দেওয়া তালিকা থেকেও অনুমান করা যায়। দলটি যে ১০ জনের নাম দিয়েছে, সেখানে সচিব ও অতিরিক্ত সচিব রয়েছেন কয়েকজন। বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রস্তাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞার নাম রয়েছে। শেষ দিনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তরীকত ফেডারেশন, জাতীয় পার্টিসহ (জেপি) অধিকাংশ দল নাম জমা দেয়।

বিকল্পধারা বাংলাদেশ জানিয়েছে, তারা পাঁচজনের নাম দিয়েছে। এর মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররফ হোসাইন ভূইঞা এবং নির্বাচন কমিশনার হিসেবে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ, সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) মুনিরা খান এবং অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর।

রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী সংগঠন ও ব্যক্তিপর্যায় থেকে আসা প্রস্তাবের বাইরে নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে অনুসন্ধান কমিটি নিজেরাও যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করতে পারবে। সব নামের মধ্য থেকে ১০ জনের নাম বাছাই করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাবে অনুসন্ধান কমিটি। সেখান থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও চারজন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবেন রাষ্ট্রপতি।

বর্তমান ইসির মেয়াদ ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হচ্ছে। তবে ১৪ ফেব্রুয়ারির আগে এই কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে নাম জমা দিতে পারবে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে নতুন ইসি গঠিত হবে কি না, সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।

স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম আইন অনুযায়ী ইসি গঠিত হচ্ছে। গত ২৭ জানুয়ারি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ বিল-২০২২ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আর ইসি গঠনে যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ের জন্য ৫ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে সভাপতি করে ছয় সদস্যের অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়।

অবশ্য অনুসন্ধান কমিটির সূত্রমতে, নাম সুপারিশের জন্য তাদের সময় দেওয়া হয়েছে ১৫ কার্যদিবস। সেই হিসেবে তাদের হাতে ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় আছে। আজ ও কাল বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠক করবে কমিটি। নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ে আজ শনিবার দুই দফায় এবং আগামীকাল রোববার বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠক করবে অনুসন্ধান কমিটি। ইতিমধ্যে ৬০ জনের বেশি বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

অনুসন্ধান কমিটির সাচিবিক দায়িত্বে থাকা মন্ত্রিপরিষদ সূত্রে জানা গেছে, প্রথমে আজ বেলা ১১টায় যে ২০ জনের সঙ্গে বৈঠক হবে, তাঁদের মধ্যে আছেন আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, ফিদা এম কামাল, ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন, মুনসুরুল হক চৌধুরী, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এম কে রহমান, শাহদীন মালিক, এ জি মাহমুদ আলী, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান, শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আসিফ নজরুল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য কামরুল হাসান খান, বিএমএর সভাপতি মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক মাহফুজা খানম, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি জসিম উদ্দিন, ব্রতীর নির্বাহী পরিচালক শারমিন মুরশিদ এবং ফেয়ার ইলেকশন মনিটরিং অ্যালায়েন্সের (ফেমা) সভাপতি মুনিরা খান।

অনুসন্ধান কমিটি আজ দুপুরে এবং আগামীকাল যেসব বিশিষ্টজনের সঙ্গে বৈঠক করবে তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম, সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার গোলাম রহমান, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক আইনুন নিশাত, শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল, অ্যাটকোর সভাপতি অঞ্জন চৌধুরী, সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নোয়াবের সভাপতি এ কে আজাদ, একাত্তর টিভির প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু প্রমুখ।

আজ ও আগামীকাল বিশিষ্টজনদের সঙ্গে বৈঠকের পর অনুসন্ধান কমিটি ইসি গঠনে তাদের সুপারিশের বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।

scroll to top